বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। নীল জলরাশি আর নারকেল গাছে ঘেরা এই ৮ বর্গকিলোমিটারের ক্ষুদ্র দ্বীপটি পর্যটকদের কাছে স্বপ্নের গন্তব্য হলেও, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে এটি নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। বিশেষ করে, 'সেন্টমার্টিন দ্বীপে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি'— এই গুঞ্জনটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিশাল প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগর নিয়ন্ত্রণ করা পরাশক্তি আমেরিকার কাছে বঙ্গোপসাগরের এই ছোট্ট দ্বীপটির গুরুত্ব কোথায়? কেনই বা বারবার সেন্টমার্টিনের নাম আমেরিকার সাথে জড়িয়ে আলোচনায় আসে? চলুন, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে এর পেছনের কারণগুলো বিশ্লেষণ করা যাক।

কেন সেন্টমার্টিন পরাশক্তিদের 'নজরে' বলে মনে করা হয়?



আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকার মূল নজর শুধু সেন্টমার্টিন দ্বীপের দিকে নয়, বরং তাদের নজর পুরো বঙ্গোপসাগরের (Bay of Bengal) দিকে। আর সেন্টমার্টিন হলো সেই বঙ্গোপসাগরের একটি কৌশলগত পয়েন্ট। এর পেছনে প্রধান কয়েকটি কারণ হলো:

১. ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (IPS) ও সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ:
বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ২৫ শতাংশ এবং চীনের জ্বালানি আমদানির বিশাল একটি অংশ বঙ্গোপসাগর ও মালাক্কা প্রণালি হয়ে যাতায়াত করে। আমেরিকা তাদের 'ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি'র অংশ হিসেবে এই সমুদ্রপথে অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে চায়। বঙ্গোপসাগরের ওপর নজরদারি চালানোর জন্য সেন্টমার্টিনের মতো একটি পয়েন্ট কৌশলগতভাবে দারুণ সুবিধাজনক।

২. চীনের প্রভাব মোকাবিলা (Countering China):
চীন দীর্ঘদিন ধরে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে তাদের 'স্ট্রিং অব পার্লস' (String of Pearls) নীতির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করছে। মিয়ানমারের কিয়াউকপিউ সমুদ্রবন্দর এবং শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটায় চীনের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। চীনের এই আধিপত্য রুখতে আমেরিকার বঙ্গোপসাগরে একটি শক্ত অবস্থান প্রয়োজন।

৩. মিয়ানমার ও আরাকান পরিস্থিতি:
সেন্টমার্টিন দ্বীপটি মিয়ানমারের আরাকান (রাখাইন) উপকূলের খুব কাছাকাছি অবস্থিত। বর্তমানে মিয়ানমারে তীব্র গৃহযুদ্ধ চলছে এবং সেখানে চীন ও রাশিয়ার ইন্ধন রয়েছে। এই অঞ্চলে নজরদারি এবং ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য আমেরিকার কাছে এই এলাকার গুরুত্ব অপরিসীম।

রাজনৈতিক বিতর্ক: শেখ হাসিনার দাবি বনাম মার্কিন অবস্থান



সেন্টমার্টিন নিয়ে আলোচনা সবচেয়ে বেশি উত্তাপ ছড়ায় বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বিস্ফোরক মন্তব্যের পর।

"শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছিলেন যে, আমেরিকা সেন্টমার্টিন দ্বীপটি ইজারা (Lease) নিতে চায়, যাতে তারা সেখানে একটি বিমান বা সামরিক ঘাঁটি তৈরি করতে পারে। তিনি আরও দাবি করেছিলেন, দ্বীপটি আমেরিকার হাতে তুলে দিলে তার ক্ষমতায় থাকতে কোনো অসুবিধা হতো না।"


তবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই দাবিকে সরাসরি এবং কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার একাধিকবার সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করেছেন যে:
"যুক্তরাষ্ট্র কখনোই বাংলাদেশের কাছে সেন্টমার্টিন দ্বীপ চায়নি। আমরা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করি এবং এই দ্বীপটি নেওয়ার কোনো পরিকল্পনাই আমেরিকার নেই।"


সেন্টমার্টিনে সামরিক ঘাঁটির ভৌগোলিক বাস্তবতা কতটা সত্য?



রাজনৈতিক মঞ্চে সেন্টমার্টিনে সামরিক ঘাঁটির কথা বলা হলেও, সামরিক ও ভৌগোলিক বিশেষজ্ঞরা একে অনেকটাই 'অবাস্তব' বলে মনে করেন।

কেন সেন্টমার্টিনে সামরিক ঘাঁটি করা কঠিন?
১. আয়তন ও পরিবেশ: মাত্র ৮ বর্গকিলোমিটারের একটি প্রবাল দ্বীপে বিশাল রানওয়ে বা নৌঘাঁটি তৈরি করা পরিবেশগত ও কৌশলগত দিক থেকে প্রায় অসম্ভব।
২. পানির গভীরতা: দ্বীপটির চারপাশের সমুদ্র খুব বেশি গভীর নয়। আমেরিকার বিমানবাহী রণতরী বা সাবমেরিন ভেড়ানোর জন্য যে বিশাল ড্রাফটের প্রয়োজন, তা সেখানে নেই।
৩. প্রাকৃতিক দুর্যোগ: বঙ্গোপসাগরের এই অঞ্চলটি প্রবল ঘূর্ণিঝড়প্রবণ। একটি স্থায়ী সামরিক ঘাঁটির জন্য এটি মোটেও নিরাপদ কোনো স্থান নয়।


পরিশেষে বলা যায়: আমেরিকা সেন্টমার্টিন দ্বীপে আক্ষরিক অর্থেই কোনো ইট-পাথরের 'সামরিক ঘাঁটি' বানাতে চায়— এমন তত্ত্ব বাস্তবের চেয়ে রাজনৈতিক কল্পকাহিনি বা রূপক হিসেবেই বেশি ব্যবহার হয়েছে। মূলত, আমেরিকা চায় বাংলাদেশ তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে (IPS) যোগ দিক এবং বঙ্গোপসাগরে চীনকে রুখতে যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলগত সুবিধা দিক। আর এই বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক খেলার একটি প্রতীকী নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে 'সেন্টমার্টিন'।