গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলাধীন চন্দ্রা ট্রাইমোড় থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। দূরত্ব মাত্র ৩৮ থেকে ৪০ কিলোমিটার। স্বাভাবিক গতিতে এই পথটুকু পাড়ি দিতে সর্বোচ্চ এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগার কথা। কিন্তু বাস্তবে এই পথ পাড়ি দেওয়া যাত্রীদের কাছে এক দীর্ঘমেয়াদি দুঃস্বপ্নের নাম।

বছরের পর বছর ধরে এই রুটে যাতায়াতকারী যাত্রী, চাকরিজীবী এবং বিশেষ করে বিদেশগামী প্রবাসীরা অবর্ণনীয় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। কখনো কখনো এইটুকু পথ পার হতে ৩ থেকে ৫ ঘণ্টাও লেগে যায়। যানজটের কারণে ফ্লাইট মিস করার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও এই রুটে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কিন্তু কেন এই রুটে এতো যানজট? চলুন জেনে নিই এর পেছনের মূল কারণ ও সম্ভাব্য সমাধানগুলো।

যানজটের নেপথ্যে যত দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা



১. উত্তরবঙ্গের গাড়ির প্রবল চাপ ও চন্দ্রা মোড়ের অব্যবস্থাপনা:
চন্দ্রা ট্রাইমোড়কে বলা হয় উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার। প্রতিদিন উত্তরবঙ্গের প্রায় ২২ থেকে ২৪টি জেলার হাজার হাজার বাস, ট্রাক এবং কাভার্ড ভ্যান এই চন্দ্রা হয়ে ঢাকায় প্রবেশ করে। কিন্তু চন্দ্রা মোড়ে গাড়িগুলোর যত্রতত্র পার্কিং, রাস্তার ওপর যাত্রী ওঠানামা করানো এবং অবৈধ বাস স্ট্যান্ডের কারণে শুরুতেই একটি বিশাল জ্যামের সৃষ্টি হয়, যার প্রভাব গিয়ে পড়ে সফিপুর ও মৌচাক পর্যন্ত।

২. শিল্পাঞ্চলের প্রভাব এবং যত্রতত্র রাস্তা পারাপার:
চন্দ্রা থেকে শুরু করে সফিপুর, কোনাবাড়ি, ভোগড়া, বোর্ডবাজার এবং টঙ্গী— পুরো রুটটি দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল। এই মহাসড়কের দুই পাশে শত শত তৈরি পোশাক কারখানা (গার্মেন্টস) অবস্থিত। সকাল বেলা শ্রমিকদের কারখানায় ঢোকার সময় এবং বিকেলে ছুটির সময় লাখ লাখ শ্রমিক একসাথে মহাসড়কে নেমে আসে। পর্যাপ্ত ফুটওভার ব্রিজ না থাকায় বা ব্যবহার না করায় তারা ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হয়, ফলে বাধ্য হয়েই মহাসড়কে গাড়ির গতি একদম শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।

৩. দীর্ঘমেয়াদি বিআরটি (BRT) প্রকল্প:
গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত যানজটের সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘমেয়াদি কারণ হলো বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (BRT) প্রকল্পের কাজ। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই কাজের কারণে মহাসড়কের প্রশস্ততা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। রাস্তার মাঝখানে খোঁড়াখুঁড়ি, নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা এবং কাজের ধীরগতির কারণে পুরো রুটটি একটি সরু গলিতে পরিণত হয়েছে।

৪. ফিটনেসবিহীন লোকাল পরিবহন ও অবৈধ বাজার:
মহাসড়ক হলেও এই রুটে দাপিয়ে বেড়ায় অসংখ্য ফিটনেসবিহীন লোকাল বাস, লেগুনা এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। এরা কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলে। এছাড়া চান্দনা চৌরাস্তা, টঙ্গী বাজার ও চেরাগআলী এলাকায় রাস্তার একটি বড় অংশ দখল করে বসেছে অবৈধ কাঁচাবাজার ও ফলের আড়ত।

৫. দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও জলাবদ্ধতা:
বর্ষাকাল বা সামান্য বৃষ্টি হলেই এই রুটের যাত্রীদের ভোগান্তি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে টঙ্গী, বোর্ডবাজার এবং চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল হওয়ায় রাস্তায় হাঁটু পানি জমে যায়। পানির নিচে থাকা খানাখন্দে পড়ে গাড়ি বিকল হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তা ব্লক হয়ে থাকার দৃশ্য এখানে খুবই সাধারণ।

সমাধানের উপায়: কীভাবে মিলবে মুক্তি?



এই দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা থেকে একদিনে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়, তবে কর্তৃপক্ষ এবং যাত্রীদের সমন্বিত উদ্যোগে এই ভোগান্তি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব:

"সড়ক পরিবহন ও ট্রাফিক বিভাগকে এই রুটের যানজট নিরসনে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় বিদেশগামী যাত্রী ও দেশের অর্থনীতির ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়তেই থাকবে।"


কর্তৃপক্ষের যা করণীয়যাত্রীদের যা করণীয়
১. বিআরটি (BRT) প্রকল্পের কাজ দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করে রাস্তা চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়া।১. বিদেশগামী যাত্রীদের ফ্লাইটের অন্তত ৫-৬ ঘণ্টা আগে বাড়ি থেকে বের হওয়া, যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত জ্যামে পড়লেও ফ্লাইট মিস না হয়।
২. মহাসড়কের ওপর গড়ে ওঠা অবৈধ বাজার, বাস স্ট্যান্ড এবং যত্রতত্র পার্কিং কঠোরভাবে উচ্ছেদ করা।২. গুগল ম্যাপে (Google Maps) লাইভ ট্রাফিক আপডেট চেক করে বের হওয়া এবং জ্যাম থাকলে বিকল্প রুট (যেমন: বাইপাইল-আশুলিয়া) ব্যবহার করা।
৩. শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিকদের রাস্তা পারাপারের জন্য পর্যাপ্ত ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ ও তার ব্যবহার নিশ্চিত করা।৩. যথাসম্ভব লোকাল বাস এড়িয়ে সরাসরি বা ডিরেক্ট রুটের পরিবহন ব্যবহার করা।
৪. জলাবদ্ধতা নিরসনে মহাসড়কের দুই পাশের ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা।৪. ভারী লাগেজ থাকলে হাতে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে প্রাইভেট কার বা ট্যাক্সি বুক করা।


পরিশেষে, চন্দ্রা থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত যাতায়াত ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি।