রাজধানী ঢাকার ব্যস্ত জীবনের আড়ালে নীরবে চলছে এক অন্ধকার জগত। আবাসিক হোটেল, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট থেকে শুরু করে এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও ছড়িয়ে পড়েছে রমরমা দেহব্যবসা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযানের পরও থামানো যাচ্ছে না এই অবৈধ চক্রগুলোকে।

একসময় ঢাকার নির্দিষ্ট কিছু এলাকা বা পতিতাপল্লীকেন্দ্রিক এই ব্যবসা পরিচালিত হলেও, আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এর ধরন পুরোপুরি পাল্টে গেছে। এখন আর নির্দিষ্ট কোনো গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই এই অনৈতিক কার্যকলাপ।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে 'এসকর্ট' বাণিজ্য


খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমান সময়ে দেহব্যবসার বড় একটি অংশ পরিচালিত হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে। ফেসবুকের ভুয়া পেজ, টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ এবং বিভিন্ন ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার করে গড়ে উঠেছে বিশাল এক নেটওয়ার্ক।

এসকর্ট সার্ভিসের নামে অনলাইনে মেয়েদের ছবি ও রেট দিয়ে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করা হয়। এরপর চুক্তি চূড়ান্ত হলে রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকার (যেমন: গুলশান, বনানী, উত্তরা ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা) ভাড়ায় চালিত বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে অথবা নামিদামি হোটেলে ক্লায়েন্টদের সেবা দেওয়া হয়।

আবাসিক হোটেল ও স্পা সেন্টারের আড়ালে অপরাধ


ভিআইপি এলাকার বাইরে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার মাঝারি ও নিম্নমানের আবাসিক হোটেলগুলোতেও দীর্ঘকাল ধরে এই ব্যবসা চলে আসছে। বিশেষ করে ফার্মগেট, মহাখালী, ফকিরাপুল, মগবাজার ও মিরপুর এলাকার কিছু চিহ্নিত হোটেলে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঘণ্টার চুক্তিতে রুম ভাড়া দেওয়া হয়।

এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে 'ম্যাসাজ পার্লার' বা 'স্পা সেন্টার'-এর আড়ালেও এই অবৈধ ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠেছে। বাইরে থেকে পরিপাটি বিউটি সেলুন মনে হলেও ভেতরে চলে অনৈতিক কার্যকলাপ।

"গ্রাম বা মফস্বল থেকে আসা অনেক অসহায় নারী ও তরুণীকে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ঢাকায় এনে জোরপূর্বক এই অন্ধকার জগতে ধাবিত করে একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী চক্র। লোকলজ্জা ও ব্ল্যাকমেইলের ভয়ে অনেকেই আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন না।"


আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও চ্যালেঞ্জ


পুলিশ ও র‍্যাব নিয়মিতভাবে ঢাকার বিভিন্ন ফ্ল্যাট ও হোটেলে অভিযান চালিয়ে এই চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করছে। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধীরা জামিনে বের হয়ে আবারও একই পেশায় জড়িয়ে পড়ে।

দেহব্যবসা বিস্তারের প্রধান কারণসমূহ
১. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অ্যাপের অপব্যবহার এবং মনিটরিংয়ের অভাব।
২. বেকারত্ব, দারিদ্র্য এবং তরুণীদের মিথ্যা চাকরির প্রলোভন।
৩. ফ্ল্যাট বা বাসা ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে মালিকদের অসচেতনতা ও তথ্য গোপন।
৪. সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাব।


সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, বেকারত্ব দূরীকরণ এবং বাসা ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে মালিকদের আরও কঠোর জবাবদিহিতা।